মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যকর্ম

 মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যকর্মের পূর্ণাঙ্গ সমালোচনা

১. ভূমিকা: মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যিক অবস্থান

মার্গারেট ড্র্যাবল (জন্ম ১৯৩৯), যিনি সাহিত্য জগতে একজন স্বনামধন্য ব্রিটিশ লেখিকা হিসেবে পরিচিত, ১৯৬০-এর দশক থেকে বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীর সাহিত্যিক পরিমণ্ডলে এক অবিস্মরণীয় ছাপ রেখেছেন । তার সাহিত্যকর্মের বিশাল পরিধি কেবল উপন্যাসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রবন্ধ, জীবনী এবং সমালোচনামূলক লেখালেখির মাধ্যমে তার বহুমুখী প্রতিভা সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে । তার লেখার মূল বিষয়বস্তু হলো নারীদের জটিল জীবনযাত্রা, সমাজের বেঁধে দেওয়া প্রত্যাশা এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের অনুসন্ধান। এই বিষয়গুলো তিনি তার নিজের জীবন এবং সমকালীন ব্রিটেনের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করার মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছেন ।   


ড্র্যাবলের সাহিত্যিক জীবনের শুরু ঃ------- 

ড্র্যাবলের সাহিত্যিক জীবনের শুরু যুদ্ধোত্তর ব্রিটেনের এক উত্তাল সময়ে, যখন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন আসছিল । বিশেষত, ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকের ‘সেকেন্ড ওয়েভ ফেমিনিজম’ (second-wave feminism) বা দ্বিতীয় ঢেউয়ের নারীবাদের প্রেক্ষাপটে তার কাজগুলো বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে । এই আন্দোলনটি নারীর ভোটাধিকারের মতো আইনি অধিকারের বাইরে গিয়ে তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্র, যেমন রাজনীতি, কর্মক্ষেত্র, পরিবার এবং যৌনতা নিয়ে আলোচনা শুরু করে । ড্র্যাবলের উপন্যাসগুলো শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির নারীদের জীবনযুদ্ধ, দ্বিধা এবং নৈতিকতার প্রশ্নগুলোকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয় ।   


এই প্রতিবেদনটি মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যিক জীবনের একটি পূর্ণাঙ্গ ও গভীর বিশ্লেষণ প্রদান করবে। এর মাধ্যমে তার লেখার শৈলীর বিবর্তন, বিষয়বস্তুর বিস্তার এবং সমকালীন সাহিত্যিক ও সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে তার জটিল সম্পর্ককে উন্মোচন করা হবে। এই বিশ্লেষণ তার সাহিত্যিক প্রতিভার মূল্যায়নের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য কাঠামো তৈরি করবে। ড্র্যাবলের সাহিত্যিক যাত্রা ছিল জীবনের বাস্তবতার সঙ্গে তার ব্যক্তিগত বোঝাপড়ার এক গভীর প্রকাশ। যখন তিনি একজন অভিনেত্রী হিসেবে গর্ভবতী হওয়ার কারণে তার ভূমিকা সীমিত হয়ে গিয়েছিল, তখনই তিনি লেখালেখিকে “নিজেকে সঙ্গ দেওয়ার” একটি উপায় হিসেবে বেছে নেন । এই ব্যক্তিগত প্রেক্ষাপটই তার উপন্যাসের প্রধান বিষয়বস্তু, যেমন কর্মজীবনের সঙ্গে মাতৃত্বের ভারসাম্য রক্ষার লড়াইকে  একটি অনন্য আন্তরিকতা ও গভীরতা দিয়েছে, যা তার কাজগুলোকে নিছক সাহিত্যিক সৃষ্টি থেকে এক প্রজন্মের জীবনযুদ্ধের দলিলে পরিণত করেছে।   


২. প্রারম্ভিক পর্যায়: নারী অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত পরিচয়ের সন্ধান (ষাটের দশক)

মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যিক জীবনের প্রথম পর্যায়টি (ষাটের দশক) মূলত আত্মজৈবনিক এবং মনস্তাত্ত্বিক আখ্যান দ্বারা চিহ্নিত। এই সময়ের উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একজন একক নারী চরিত্র, যে তার নিজের পরিচিতি এবং জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে বেড়ায় । তার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা, যেমন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক এ. এস. বায়াটের সঙ্গে তার কঠিন সম্পর্ক, এবং একজন অভিনেতার স্ত্রী হিসেবে মাতৃত্বের সমস্যা—এগুলো তার প্রথম দিককার লেখাগুলোতে প্রতিফলিত হয়েছে ।   


A Summer Bird-Cage (১৯৬২)

ড্র্যাবলের প্রথম উপন্যাস, A Summer Bird-Cage, একজন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত নারীর স্বাধীনতার প্রশ্নটি নিয়ে লেখা। উপন্যাসের প্রধান চরিত্র সারাহ বেনেট, একজন সদ্য স্নাতক হওয়া তরুণী, যে তার জীবনের পরবর্তী ধাপ নিয়ে অনিশ্চিত । গল্পের আখ্যান তার বোন লুইসের বিবাহ এবং তার বিবাহ-বহির্ভূত সম্পর্কের মধ্য দিয়ে অগ্রসর হয় । এই উপন্যাসে দুই বোনের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সমাজের প্রচলিত রীতিনীতির সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে । উপন্যাসের শিরোনামটি নিজেই একটি শক্তিশালী রূপক হিসেবে কাজ করে, যা বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে নারীর বন্দীদশাকে চিত্রিত করে । সারাহ তার বোন এবং বন্ধুদের জীবন পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারে যে, তার উচ্চশিক্ষা তাকে পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আরোপিত গতানুগতিক ভূমিকা থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করবে । এই উপন্যাসে ড্র্যাবল শিক্ষিত নারীদের জন্য বিবাহ নামক একটি "পিঞ্জরের" (bird-cage) স্বরূপ উন্মোচন করেছেন, যা তাদের স্বাধীনতা ও আত্ম-পূরণের আকাঙ্ক্ষাকে রুদ্ধ করে দেয় ।   


The Millstone (১৯৬৫)

ড্র্যাবলের সাহিত্যিক সাফল্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হলো The Millstone। এই উপন্যাসে রোসামন্ড স্ট্যাসি নামের একজন পণ্ডিত কুমারী নারীর গল্প বলা হয়েছে, যিনি একটি যৌন সম্পর্কের পরে অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভবতী হন এবং একা হাতে সন্তানকে বড় করার সিদ্ধান্ত নেন । উপন্যাসটি ১৯৬০-এর দশকে গর্ভধারণ ও সিঙ্গেল মাদারহুডের চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেছে । তবে, এর তাৎপর্য কেবল সামাজিক বিষয়বস্তুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই উপন্যাসটি ‘উদার নৈতিক অপরাধবোধ’ (liberal guilt) এবং নৈতিক দর্শনের এক গভীর বিশ্লেষণ । রোসামন্ড তার জীবনকে কান্টের দার্শনিক নীতি অনুযায়ী পরিচালনা করতে চায়, যেখানে তিনি ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশকে সমাজের বৃহত্তর নৈতিকতার কাছে তুচ্ছ মনে করেন । মাতৃত্বের বাস্তব অভিজ্ঞতা তাকে তার এই কঠোর আদর্শের সঙ্গে আপস করতে বাধ্য করে। উপন্যাসের বাইবেল থেকে নেওয়া শিরোনামটি একটি প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। বাইবেলে ‘millstone’ বলতে শিশুদের ক্ষতি করার শাস্তিকে বোঝানো হলেও , ড্র্যাবল এই প্রতীকটি উল্টে দিয়েছেন। এখানে শিশুটি রোসামন্ডের কাছে বোঝা না হয়ে বরং ভালোবাসা, মুক্তি ও আত্ম-আবিষ্কারের এক নতুন উৎস হয়ে ওঠে ।   


Jerusalem the Golden (১৯৬৭)

Jerusalem the Golden উপন্যাসে ড্র্যাবল তার শৈশবের তিক্ত অভিজ্ঞতাকে আশ্রয় করে গল্প সাজিয়েছেন। উপন্যাসের চরিত্র ক্লারা মঘাম তার শৈশবের ‘নিরানন্দ ও শ্বাসরুদ্ধকর’ (joyless and suffocating) জীবন থেকে লন্ডনে পালিয়ে আসে । এই উপন্যাসের মাধ্যমে ড্র্যাবল তার নিজ শহর শেফিল্ডের (উপন্যাসে 'নর্থহ্যাম' নামে পরিচিত) পারিবারিক জীবনের শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশের চিত্র তুলে ধরেছেন । তার প্রথম দিককার উপন্যাসগুলোতে দেখা যায়, ড্র্যাবলের চরিত্রগুলো কেবল সামাজিক সংকটের মুখোমুখিই হয় না, বরং এক ধরনের ‘আর্টিস্টিক পলায়নবাদ’-এর শিকার হয়, যেখানে তারা বাস্তব থেকে দূরে একটি কল্পনার জগতে আশ্রয় খোঁজে । এই চরিত্রগুলো শেষ পর্যন্ত মানবীয় সম্পর্ক ও ভালোবাসার মাধ্যমে বাস্তব জগতের সঙ্গে পুনরায় যুক্ত হতে শেখে, যা ড্র্যাবলের লেখার একটি পুনরাবৃত্ত বিষয় । এই প্রবণতা তার নিজের লেখালেখির প্রাথমিক পর্যায়ের ‘আত্মকেন্দ্রিক’ (solipsistic) আখ্যান পদ্ধতির সঙ্গে সম্পর্কিত। এই প্রাথমিক কাজগুলো প্রমাণ করে যে, ড্র্যাবল কেবল সমস্যাগুলো চিহ্নিত করেননি, বরং তার চরিত্রদের মানসিক বিবর্তনের মধ্য দিয়ে তাদের সমাধানের উপায়ও অন্বেষণ করেছেন।   


৩. শৈলীগত বিবর্তন ও সামাজিক পরিধি বিস্তার (সত্তরের দশক)

১৯৭০-এর দশকে মার্গারেট ড্র্যাবলের লেখালেখি নতুন মাত্রায় প্রবেশ করে। এই সময়ে তার আখ্যানের পরিধি ব্যক্তিগত জীবন থেকে বিস্তৃত হয়ে জাতীয় ও বৈশ্বিক বিষয়গুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে । তার লেখার শৈলীও এই সময় পরীক্ষামূলক হয়ে ওঠে, যা তার সাহিত্যিক পরিপক্কতার ইঙ্গিত দেয়।   


The Waterfall (১৯৬৯)

The Waterfall উপন্যাসটি ড্র্যাবলের শৈলীগত নিরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই উপন্যাসে তিনি প্রথম পুরুষ এবং তৃতীয় পুরুষ আখ্যানের মধ্যে পরিবর্তন ঘটিয়েছেন । এই দ্বিধা বিভক্ত আখ্যানটি নারীদের মনস্তাত্ত্বিক বিভাজনকে তুলে ধরে । উপন্যাসের চরিত্র জেন গ্রে, একজন কবি ও লেখক, যিনি তার প্রেমের গল্পকে আখ্যানের মধ্য দিয়ে সাজাতে গিয়ে কখনো বাস্তব এবং কখনো কল্পনার জগতে বিচরণ করেন । এটি কেবল একটি যৌন জাগরণের গল্প নয়, বরং শিল্প ও জীবনের মধ্যে সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন তোলে । জেন গ্রে তার নিজের গল্পকে একটি রোম্যান্টিক বা ট্র্যাজিক গল্পের মতো করে সাজাতে চান, কিন্তু শেষ পর্যন্ত জীবনের বাস্তবতা তাকে বাধ্য করে এই সাহিত্যিক রূপরেখা থেকে বেরিয়ে আসতে । উপন্যাসে জেন অস্টেন ও শার্লট ব্রন্টির মতো লেখকদের প্রতি তার আখ্যানের বিরূপতা (anti-Austen) দেখায় যে ড্র্যাবল প্রচলিত সাহিত্যিক রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করছেন এবং তার নিজস্ব পথ তৈরি করছেন ।   


The Needle's Eye (১৯৭২) এবং পরবর্তী কাজ

এই সময়ে প্রকাশিত The Needle's Eye উপন্যাসটি বিত্ত, নৈতিকতা এবং আত্ম-অনুসন্ধানের মতো জটিল বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে । এটি তার পূর্ববর্তী বাস্তববাদী আখ্যানের একটি জটিল সংস্করণ, যেখানে তিনি দৈনন্দিন জীবনের মধ্য থেকে নৈতিক বীরত্ব খুঁজে বের করার চেষ্টা করেন । এরপর    


The Ice Age (১৯৭৭) 


উপন্যাসে ড্র্যাবল তার আখ্যানের পরিধি আরও বিস্তৃত করেন এবং এটিকে সমালোচকরা "State of England" উপন্যাস হিসেবে আখ্যায়িত করেন । এই উপন্যাসটি মার্গারেট থ্যাচারের রাজনৈতিক উত্থান এবং ১৯৭০-এর দশকের ব্রিটেনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে রচিত । এটি সেই সময়ের সামাজিক অস্থিরতা ও হতাশার প্রতিফলন, যা ড্র্যাবলের লেখার পরিধি ব্যক্তিগত মনস্তত্ত্ব থেকে জাতীয় রাজনৈতিক বিতর্কে বিস্তারের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত ।   


ড্র্যাবলের উপন্যাসের আখ্যান পদ্ধতি তার বিষয়বস্তুর সঙ্গে সমান্তরালভাবে বিবর্তিত হয়েছে। প্রথম দিকের উপন্যাসে ব্যক্তিগত জীবনের সংকীর্ণ গণ্ডির কারণে প্রথম পুরুষ আখ্যান যথেষ্ট ছিল। কিন্তু যখন তার উপন্যাসের বিষয়বস্তু জাতীয় জীবনের জটিলতা (যেমন, The Ice Age) এবং একাধিক চরিত্রের আন্তঃসম্পর্ক (যেমন, The Middle Ground) নিয়ে কাজ করা শুরু করে, তখন তিনি সর্বজ্ঞ আখ্যান (omniscient narrator) পদ্ধতি গ্রহণ করেন । এটি তাকে একটি চরিত্রকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ না থেকে সমসাময়িক ব্রিটিশ জীবনের একটি "fragmented tapestry" বা খণ্ড খণ্ড চিত্র তৈরি করার সুযোগ দেয় । এই শৈলীগত বিবর্তন তার বিষয়বস্তুর বিবর্তনেরই একটি সরাসরি ফলাফল, যা তার সাহিত্যিক প্রতিভার গভীরতা প্রমাণ করে।   


৪. উত্তর-নারীবাদের দিকে যাত্রা এবং বিংশ শতাব্দীর শেষভাগের সমাজ

ড্র্যাবলের কর্মজীবনের মধ্যবর্তী এবং শেষ দিকের কাজগুলো একটি নতুন দিক উন্মোচন করে। এই সময় তিনি নারীবাদী আন্দোলনের সংকীর্ণ সংজ্ঞার বাইরে গিয়ে জীবনের বহুমুখী বাস্তবতাকে তুলে ধরেন । তিনি তার উপন্যাসে কেবল নারীর জীবন নয়, বরং সমাজের বৃহত্তর প্রেক্ষাপট, যেমন মধ্যবিত্ত জীবনের সংকট, রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং বিশ্বব্যাপী অসাম্য নিয়ে আলোচনা করেছেন।   


The Middle Ground (১৯৮০)

The Middle Ground উপন্যাসে ড্র্যাবল মধ্যবয়সী একদল চরিত্রের জীবন, বিশেষ করে সাংবাদিক কেট আর্মস্ট্রং-এর জীবনকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ-পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যজীবনের সংকট (midlife crisis) তুলে ধরেছেন । এই উপন্যাসটি একটি সরল প্লটকে অনুসরণ করে না, বরং এটি বিভিন্ন চরিত্রের মন, অতীত অভিজ্ঞতা এবং সম্পর্কের মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ সমাজের এক জটিল চিত্র তৈরি করে । উপন্যাসের মূল বার্তাটি হলো, জীবনকে কোনো সরল সমীকরণ বা ছকে ফেলা যায় না, এবং কোনো এক মাত্রিক ব্যাখ্যা দিয়ে জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতাকে সংজ্ঞায়িত করা সম্ভব নয় । বরং, মানবীয় সম্পর্ক ও সংযোগের মাধ্যমে বিশৃঙ্খলার মধ্যেও শৃঙ্খলা ও অর্থ খুঁজে পাওয়া সম্ভব । কেট আর্মস্ট্রংয়ের চরিত্রটি প্রমাণ করে যে, একজন নারী তার মধ্যবয়সেও নিজের জীবনে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেতে পারে এবং আশার সঙ্গে ভবিষ্যৎকে মোকাবিলা করতে পারে ।   


The Radiant Way ট্রিলজি (১৯৮৭)

The Radiant Way ট্রিলজি ড্র্যাবলের সাহিত্যিক বিবর্তনের এক গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। এই ত্রয়ী সম্পর্কে ড্র্যাবল নিজেই বলেছেন, এটি “নারীর বই নয়, বরং পশ্চিমা সভ্যতার অবক্ষয় নিয়ে লেখা” । এই উক্তিটি তাকে “ফেমিনিস্ট” লেখিকা হিসেবে তার পরিচিতি থেকে সরে আসতে সাহায্য করে। এই ট্রিলজিটি উত্তর-নারীবাদী সাহিত্যের (postfeminist fiction) একটি উদাহরণ । এখানে নারীর নিপীড়ন ও প্রতিরোধের সরল আখ্যানের বদলে একাধিক প্লটলাইন ব্যবহার করা হয়েছে, যা তাদের জীবনের বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে । এই উপন্যাসে ড্র্যাবল লিঙ্গ সম্পর্কের একটি মেরুকৃত দৃষ্টিভঙ্গি ত্যাগ করে পুরুষ ও নারী উভয়েরই "ভদ্রতা ও বোকামি" (decencies and follies) তুলে ধরেছেন, যা তার লেখার পরিপক্কতার ইঙ্গিত । এই উপন্যাসের মাধ্যমে ড্র্যাবল দেখিয়েছেন যে, একজন নারী চরিত্রকে কেবল পিতৃতান্ত্রিক ব্যবস্থার শিকার হিসেবে চিত্রিত না করে, বরং তার নিজের ত্রুটি ও জীবনের জটিলতার সঙ্গে লড়াই করা একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে উপস্থাপন করা সম্ভব 。   


ড্র্যাবলের সাহিত্যিক যাত্রা নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে তা এমন একটি দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে তিনি সামাজিক নিপীড়নের উৎসকে কেবল পুরুষতন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্যে অন্বেষণ করেছেন। প্রথম দিকের নারীবাদী সাহিত্যের মূল লক্ষ্য ছিল নারীর পরিচয় পুনরুদ্ধার করা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা । কিন্তু ড্র্যাবল তার পরের উপন্যাসগুলোতে দেখিয়েছেন যে নারীর অভিজ্ঞতা এত সরল নয়। তিনি স্বেচ্ছায় একগামী প্রেমের, মাতৃত্বের, এবং নারী-পুরুষ উভয়ের বন্ধুত্বের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন । তার এই পরিবর্তনটি তার নিজের এবং তার সময়ের নারীবাদী চিন্তার বিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন।   


৫. ড্র্যাবলের লেখার স্টাইল ও সাহিত্যিক কৌশল

মার্গারেট ড্র্যাবলকে "বাস্তববাদী ধারার" (realist tradition) একজন বিশিষ্ট প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য করা হয় । তার লেখা জর্জ এলিয়ট এবং আর্নল্ড বেনেট-এর মতো ভিক্টোরিয়ান লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত, যাদের সাহিত্যকর্মের সঙ্গে তিনি তার সমালোচনামূলক কাজের মাধ্যমে গভীরভাবে পরিচিত ছিলেন । তিনি দৈনন্দিন জীবনের সাধারণ অভিজ্ঞতার মধ্য থেকে "বীরত্ব" (heroism) খুঁজে বের করেন, যা সাধারণত "anti-heroic" বা বীরত্ব-বিরোধী বিষয়বস্তু হিসেবে বিবেচিত হয় ।   


ড্র্যাবলের লেখার শৈলীতে বেশ কিছু স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। তিনি ব্যঙ্গাত্মক কৌতুক, তীক্ষ্ণ সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং গভীর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করেন । তার উপন্যাসের কেন্দ্রীয় নারী চরিত্রগুলোর একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর ও বাচনভঙ্গি (distinct speech pattern and cadence) রয়েছে, যা তার সাহিত্যিক প্রতিভার এক গুরুত্বপূর্ণ দিক । এটি তার প্রথম দিককার প্রথম-পুরুষ আখ্যানের উপন্যাসগুলোতে বিশেষভাবে সত্য, তবে সর্বজ্ঞ আখ্যানের উপন্যাসগুলোতেও তিনি চরিত্রের অভ্যন্তরীণ জীবনকে দক্ষতার সঙ্গে তুলে ধরেছেন ।   


ড্র্যাবল একজন অত্যন্ত পাণ্ডিত্যপূর্ণ লেখক । তিনি ১৯৮৫ এবং ২০০০ সালে প্রকাশিত    The Oxford Companion to English Literature-এর সম্পাদক হিসেবেও কাজ করেছেন, যা তার সাহিত্যিক জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণ করে । তার লেখা পূর্ববর্তী লেখকদের (যেমন জেন অস্টেন, শার্লট ব্রন্টি) এবং বাইবেলের ( The Millstone) রেফারেন্স দিয়ে সমৃদ্ধ । ড্র্যাবল তার সৃজনশীল এবং সমালোচনামূলক সত্তাকে "চাঁদের আলো এবং অন্ধকার" অংশের সঙ্গে তুলনা করেছেন । তার সমালোচনামূলক মনকে তিনি "দিনের আলো"র সঙ্গে তুলনা করেন, যা তার লেখার রহস্যময় দিককে আলোকিত করতে পারে ।    


The Oxford Companion সম্পাদনা করার অভিজ্ঞতা তাকে ইংরেজি সাহিত্যের ঐতিহ্য সম্পর্কে একটি বিস্তৃত ও গভীর ধারণা দিয়েছে, যা তার নিজস্ব লেখায় আন্তঃপাঠ্য রেফারেন্স ব্যবহারের মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে । এটি কেবল তার পাণ্ডিত্যের প্রমাণ নয়, বরং তার নিজস্ব সাহিত্যিক শৈলীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।   


৬. সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া ও সাহিত্য জগতে ড্র্যাবলের অবস্থান

মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যকর্মের সমালোচনামূলক মূল্যায়ন প্রায়শই তাকে "ফেমিনিস্ট লিটারারি মুভমেন্ট" (feminist literary movement) এর সঙ্গে যুক্ত করে । তিনি তার সমসাময়িক নারীবাদী লেখকদের মতোই আধুনিক শিক্ষিত নারীর চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে লেখেন । তবে তিনি নিজে "ফেমিনিস্ট" হিসেবে পরিচিতি পেতে অস্বীকার করেছেন, যা তার এবং তার কাজের মূল্যায়নের এক জটিল দিক ।   


সমালোচকরা তার লেখাকে নারীর অধিকার ও পিতৃতন্ত্রের সংকীর্ণ ছকে আবদ্ধ করতে চেয়েছেন, কিন্তু ড্র্যাবলের কাজ এই সংজ্ঞাকে ছাড়িয়ে গেছে। তার উপন্যাসের প্রধান চরিত্রগুলো ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে মূল্য দিলেও মাতৃত্বের পারিবারিক দায়িত্বকে গুরুত্ব দিয়েছে, যা উগ্র নারীবাদীদের সমালোচনার কারণ হয়েছিল । তার সাহিত্যিক যাত্রা নারীবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে শুরু হলেও, ধীরে ধীরে তা এমন একটি দর্শনে রূপান্তরিত হয়েছে যেখানে তিনি সামাজিক নিপীড়নের উৎসকে কেবল পুরুষতন্ত্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বৃহত্তর সামাজিক, রাজনৈতিক এবং মনস্তাত্ত্বিক জটিলতার মধ্যে অন্বেষণ করেছেন।   


মার্গারেট ড্র্যাবল ও তার সমসাময়িক সাহিত্যিকবৃন্দ

ড্র্যাবলের সাহিত্যিক অবস্থান তার সমসাময়িক লেখকদের সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে আরও স্পষ্ট হয়। তার বড় বোন এ. এস. বায়াট নিজেও একজন বিখ্যাত ঔপন্যাসিক। তাদের দুজনের মধ্যে শৈশব থেকেই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল, যা সাহিত্য জগতেও প্রকাশ পেয়েছে । বায়াট ড্র্যাবলের আগেই তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশ করেন, যা দুই বোনের মধ্যে প্রতিযোগিতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে । তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা কেবল ব্যক্তিগত কৌতূহলের বিষয় নয়, বরং এটি ড্র্যাবলের লেখার মূল বিষয়বস্তুর (যেমন পারিবারিক টানাপোড়েন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং প্রত্যাশা) একটি বাস্তব প্রতিফলন । এটি সাহিত্য ও জীবনের মধ্যে সম্পর্কের এক অদ্ভুত উদাহরণ, যা ড্র্যাবল তার উপন্যাসে বারবার তুলে ধরেন। ড্র্যাবল ডরিস লেসিংকে তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং একজন প্রভাব বিস্তারকারী লেখিকা হিসেবে উল্লেখ করেছেন । লেসিংয়ের মতো, তিনিও নিজেকে সরাসরি "ফেমিনিস্ট" হিসেবে পরিচিত করতে অনিচ্ছুক হলেও, ব্রিটিশ নারীদের জীবনযাত্রার একজন অবিচল লেখক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছেন ।   


ড্র্যাবল এবং তার সমসাময়িক কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখকদের মধ্যেকার সম্পর্ক ও প্রভাবের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে একটি সারণীতে তুলে ধরা হলো:


সাহিত্যিক সম্পর্ক/প্রভাব সাহিত্যিক সম্পর্ক ও প্রেক্ষাপট

এ. এস. বায়াট

বোন ও সাহিত্যিক প্রতিদ্বন্দ্বী    


শৈশবের পারিবারিক টানাপোড়েন থেকে সৃষ্ট তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা যা তাদের সাহিত্যকর্মেও প্রতিফলিত হয়েছে (যেমন, বায়াটের The Game)। তারা একে অপরের লেখা পড়েন না ।   


ডরিস লেসিং

দীর্ঘদিনের বন্ধু ও প্রভাব    


লেসিংয়ের মতো, ড্র্যাবলও নিজেকে সরাসরি নারীবাদী হিসেবে পরিচিত করতে অনিচ্ছুক । উভয়েই নারীদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিবরণীকার হিসেবে বিবেচিত হন ।   


আর্নল্ড বেনেট

জীবনীকার ও সাহিত্যিক আদর্শ    


ড্র্যাবল বেনেটের জীবনী লিখেছেন এবং তার লেখার বাস্তববাদী ধারা ও সামাজিক পর্যবেক্ষণে বেনেটের প্রভাব সুস্পষ্ট ।   


ড্র্যাবলের সাহিত্যকর্মকে এই প্রেক্ষাপটে বিচার করলে বোঝা যায় যে, তার অবস্থান কোনো একটি একক ধারায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি তার লেখায় জেন অস্টেন ও শার্লট ব্রন্টির মতো ভিক্টোরিয়ান ও রোম্যান্টিক লেখকদের থেকে শুরু করে তার সমসাময়িক লেখকদের প্রভাবকে আত্মস্থ করেছেন এবং নিজস্ব এক নতুন পথ তৈরি করেছেন, যা আধুনিক ব্রিটিশ সাহিত্যের ইতিহাসে তার একটি অনন্য অবস্থান নিশ্চিত করেছে।


৭. উপসংহার: মার্গারেট ড্র্যাবলের স্থায়ী উত্তরাধিকার

মার্গারেট ড্র্যাবলের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার হলো আধুনিক ব্রিটিশ নারীত্বের একটি বাস্তবসম্মত ও বহুস্তরীয় চিত্রায়ণ। তিনি কেবল নারীদের অধিকার নিয়ে লেখেননি, বরং মাতৃত্ব, সম্পর্ক, নৈতিকতা এবং মধ্যজীবনের সংকটের মতো সার্বজনীন বিষয়গুলোকেও সাহিত্যের মূল ধারায় নিয়ে এসেছেন । তার চরিত্রগুলো প্রায়শই জীবনের দ্বিধা, সংকট এবং নৈতিক জটিলতার মুখোমুখি হয়, কিন্তু তারা কখনো সম্পূর্ণরূপে পরাস্ত হয় না। বরং, তারা নিজেদেরকে এবং তাদের চারপাশের বিশ্বকে বুঝতে চেষ্টা করে, যা ড্র্যাবলের সাহিত্যিক দর্শনের একটি মৌলিক দিক ।   


তার কাজগুলো আজও প্রাসঙ্গিক কারণ তিনি জীবনের অসংলগ্নতা (shapeless diversity) এবং জটিলতাকে মেনে নিয়েছেন, যা আধুনিক বিশ্বেও সমানভাবে সত্য । তিনি কোনো সরল সমাধান বা "neat explanations" দেননি, বরং দেখিয়েছেন যে "no neat explanations can define or describe life" । তার সাহিত্যকর্ম কোনো একটি সংজ্ঞা বা তত্ত্বের ছকে আবদ্ধ করা যায় না, এবং এখানেই তার সাহিত্যিক প্রতিভার আসল সৌন্দর্য নিহিত। তিনি ছিলেন একজন বাস্তববাদী, যিনি তার সময়ের সমাজের একজন "fastidious chronicler" বা খুঁতখুঁতে ইতিহাসবেত্তা হিসেবে কাজ করেছেন । তার লেখায় নৈতিকতা, আত্ম-অনুসন্ধান এবং মানবীয় সম্পর্কের গভীরতা আধুনিক সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় রচনা করেছে। ড্র্যাবল কেবল তার সময়ের নারীদের নয়, বরং সকল মানুষের জন্য একটি পথ তৈরি করেছেন, যেখানে জীবনের জটিলতাকে মেনে নিয়ে তার মধ্যে অর্থ ও আশা খুঁজে পাওয়া সম্ভব।   


মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

"ওয়েটিং ফর দ্য বারবারিয়ানস" --জেএম কোয়েটজি

রুথ প্রাওয়ার ঝাবভালার 'হিট অ্যান্ড ডাস্ট' পুস্তক সমালোচনা